Dainik Sotter Kontho - দৈনিক সত্যের কণ্ঠ
ঢাকাWednesday , 21 June 2023
  • অন্যান্য

হজ্জের গুরুত্ব ও ফজিলত

ডেক্স রিপোর্ট
June 21, 2023 11:28 am । ২৬৩ জন
ছবিঃ সংগৃহীত

Google News

হজ্জ ইসলামের পঞ্চম রোকন বা স্তম্ভ । মুমিন বান্দার প্রতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের বিশেষ অনুগ্রহ এই যে, তিনি তাকে এমন কিছু ইবাদত দান করেছেন, যা দ্বারা বান্দা তার রূহানি তারাক্কি, কলবের সুকুন ও প্রশান্তি এবং দুনিয়া- আখিরাতের খায়ের ও বরকত লাভ করে থাকে । এসবের একটি হলো হজ্জ । হজ্জ ইসলামের পঞ্চম রোকন বা স্তম্ভ । নামায, রোযা, যাকাত যেমন ফরয ইবাদত, তেমনি আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমান নর- নারীর জন্য হজ্জ অন্যতম বরকতপূর্ণ অবধারিত কর্তব্য । হজ্জ আরবি শব্দ । অর্থ নিয়ত করা, দর্শন করা, সংকল্প করা, সন্ধান করা, সাক্ষাৎ করা, ইচ্ছা করা বা প্রতিজ্ঞা করাসহ কোনো মহৎ কাজের ইচ্ছা করা । শরিয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের ফরয আমলটি পালনার্থে এবং আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্য ও সন্তোষ লাভের আশায় হজ্জের নির্ধারিত সময়- সীমার ভেতরে নির্দিষ্ট আমল সম্পাদনের জন্য পবিত্র ‘ বাইতুল্লাহ ’ তথা কা’বা ঘর জেয়ারত করাকে হজ্জ বলে । আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘ মক্কা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আল্লাহর জন্য হজ্জ আদায় করা ফরয ’( সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৭) । ‘ তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর ’( সূরা- আল বাকারা, আয়াত ১৯৬) । মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ যখন আমি ইবরাহিম( আলাইহিস সালাম) কে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরিক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্য । আর মানুষের মাঝে তুমি হজ্জের ঘোষণা প্রচার করো, তাঁরা তোমার কাছে আসবে পাঁয়ে হেঁটে, উটে চড়ে এবং সর্ব- প্রকার বাহনে সওয়ার হয়ে দূর- দূরান্ত থেকে ’( সূরা হজ্জ, আয়াত ২৬- ২৭) ।

নবম হিজরীতে হজ্জ ফরয হয় । হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ১০ম হিজরীতে একবার স্বপরিবারে হজ্জ পালন করেন । মক্কা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এমন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও মহিলার জন্য জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা ফরয । এ সম্পর্কে হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা( রা.) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন । তিনি বললেন, হে মানব সকল! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর হজ্জ ফরয করেছেন । সুতরাং তোমরা হজ্জ করো । এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! প্রতি বছর কি হজ্জ করতে হবে? তিনি চুপ রইলেন এবং লোকটি এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করল । অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তাহলে প্রতি বছর হজ্জ করা ফরয হয়ে যেতো, কিন্তু তোমাদের পক্ষে তা করা সম্ভব হতো না ’( মুসলিম, হাদিস ১৩৩৭) । বারবার হজ্জ আদায় করা মুস্তাহাব । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম বলেছেন, ‘ হজ্জ একবার, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা তার জন্য নফল হবে ’( ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৮৬, আবু দাউদ হাদিস ১৭২১) ।

হাদিস শরীফে হজ্জ ফরয হওয়া মাত্র আদায় করার তাগিদ ও হুকুম দেওয়া হয়েছে । হযরত ইবনে আববাস( রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ ফরয হজ্জ আদায়ে তোমরা বিলম্ব করো না । কারণ তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে ’( সুনানে কুবরা বায়হাকী৪/৩৪০, মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৮৬৭) । অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে, হযরত ইবনে আববাস( রা.) বর্ণনা করেন, ‘ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হজ্জ করার ইচ্ছে করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয় । কারণ যে কোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে ’( ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৮৩; আবু দাউদ, হাদিস ১৭৩২) ।

একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা যে স্বচ্ছল সামর্থ্যবান ব্যক্তি সত্ত ¡ র হজ্জ আদায় করে না তাকে হতভাগা ও বঞ্চিত আখ্যায়িত করেছেন । আবু সাঈদ খুদরী( রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি আমার বান্দার শরীরকে সুস্থ রাখলাম, তার রিযিক ও আয়- উপার্জনে প্রশস্ততা দান করলাম । পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি সে আমার গৃহের হজ্জের উদ্দেশ্যে আগমন না করে তবে সে হতভাগ্য ও বঞ্চিত ’( তবারানী, হাদিস ৪৯০; সুনানে কুবরা বায়হাকী৫/২৬২; ইবনে হিববান, হাদিস ৩৬৯৫; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ১০৩১; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদিস ৫২৫৯) । শুধু তাই নয়, একসময় বায়তুল্লাহ শরীফ উঠিয়ে নেয়া হলে মানুষ হজ্জ করতে পারবে না এই আশঙ্কার কারণেও আল্লাহর রাসূল উম্মতকে তাড়াতাড়ি হজ্জ করার হুকুম করেছেন । ইবনে উমর( রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ তোমরা হজ্জ ও উমরার মাধ্যমে বায়তুল্লাহ এর উপকার গ্রহণ কর । কেননা তা ইতিপূর্বে দু’বার ধ্বংস হয়েছে । তৃতীয় বারের পর উঠিয়ে নেওয়া হবে ’( ইবনে হিববান, হাদিস ৬৭১৮; ইবনে খুযাইমা, হাদিস ২৫০৬; মুসনাদে বাযযার, হাদিস ১০৭২; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ১৬৫২) ।

কেউ হজ্জের আবশ্যকীয়তা বা ফরয হওয়া অস্বীকার করলে তাকে অমুসলিম বলে গণ্য করা হবে । আর যদি কোনো সক্ষম ব্যক্তি হজ্জ ফরয মানা সত্তে ¡ ও তা আদায় না করেন তাহলে কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত হবেন এবং তার ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘ যে অবহেলা করে ফরয হজ্জ ত্যাগ করে, আমি জানি না তার মৃত্যু ঈমানের উপর হবে কি না । হজ্জ করার শক্তি- সামর্থ্য ও অর্থ- বিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ্জ করে না তার সম্পর্কে হাদিস শরীফে কঠোর সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে । যে ব্যক্তি হজ্জ করার সামর্থ্য রাখে, তবুও হজ্জ করে না সে ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খিস্টান হয়ে তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই ’( তিরমিযী, হাদিস ৮১২, তাফসীরে ইবনে কাসীর১/৫৭৮) ।

হজ্জের ফজিলত

হজ্জ একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত । এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা একে অতি ফজিলতপূর্ণ করেছেন । হজ্জের ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে । হাদিস শরীফে মকবুল হজ্জের বহু ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে । মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলা ও তার রাসূলের প্রতি গভীর ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখায় বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ ও রওজা মোবারক যিয়ারতের মাধ্যমে । নিম্নে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো, হযরত আবু হুরায়রা( রা.) বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘ যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিবেদিতভাবে, সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতা মুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করলো, সে মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরলো ’( বুখারী, হাদিস ১৫২১; মুসলিম, হাদিস ১৩৫০) । তিনি আরও বলেছেন একবার উমরা আদায়ের পরে দ্বিতীয়বার যখন উমরা আদায় করা হয়, তখন দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহ আল্লাহ্ মাফ করে দেন । আর হজ্জে মাবরুর বা পুণ্যময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত ’( বুখারী, হাদিস ১৭৭৩; মুসলিম, হাদিস ১৩৪৯; তিরমিযী, হাদিস ৯৩৩; নাসায়ী, হাদিস ২৬২৯; ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৮৮) । কবুল হজ্জ দ্বারা উদ্দেশ্য এমন হজ্জ, যা সুন্নাত মুতাবেক সম্পন্ন হয়, যাতে পাপাচার ও গোনাহ থেকে মুক্ত থাকা হয়( রিয়াযুছ ছালেহীন হা/ ১২৮১- এর ব্যাখ্যা) । হজ্জ শুধু শারীরিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং হজ্জ পালন বান্দার পাপও মোচন করে দেয় । ফলে হজ্জ পালনকারীর পাপের বোঝা হালকা হয় এবং দারিদ্র্য দূর হয় । তবে হজ্জ পালন একমাত্র আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হতে হবে । এতে কোনো প্রকার লৌকিকতা থাকতে পারবে না । এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ( রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ তোমরা বারবার হজ্জ ও উমরা আদায় কর, কারণ কর্মকারের ও স্বর্ণকারের আগুন যেমন লোহা ও সোনা- রূপার ময়লা মুছে ফেলে তেমনিভাবে এ দুটি ইবাদত দারিদ্র্য ও পাপ মুছে ফেলে । আর হজ্জে মাবরুর বা পুণ্যময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত ’( তিরমিযী, হাদিস ৮১০; নাসায়ী, হাদিস ২৬৩১) ।
হযরত আবু হুরাইরা( রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম কি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা । প্রশ্নকারী বলেন, এরপর কোন কর্ম? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা । প্রশ্নকারী বলেন, এরপর কোন কর্ম? তিনি বললেন, তোমাদের জন্য উত্তম ও সুন্দরতম জিহাদ হলো হজ্জ, তথা মাবরুর হজ্জ( কবুল হজ্জ) ’( বুখারী, হাদিস ২৬; মুসলিম, হাদিস ৮৩; তিরমিযী, হাদিস ১৬৫৮) ।
হযরত আয়শা( রা.) হতে বর্ণিত । তিনি বলেন, ‘ ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম! জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম আমল মনে করি । কাজেই আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি বললেন, তোমাদের জন্য উত্তম ও সুন্দরতম জিহাদ হলো ‘ হজ্জ ’, তথা মাবরুর হজ্জ ’( বুখারী, হাদিস ১৫২০) ।
হযরত ইবনে উমর( রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘ আল্লাহ তা’আলা হজ্জকারীকে তার উটনীর প্রতি কদমে একটি নেকি লেখেন কিংবা একটি গুনাহ মুছে দেন । অথবা একটি মর্তবা বুলন্দ করেন ’( ইবনে হিব্বান, হাদিস ১৮৮৭; শুআবুল ঈমান, বায়হাকি, হাদিস ৪১১৬) । হযরত সাহল ইবনে সা’দ আসসায়েদী( রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বামে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যা কিছু আছে যেমন, গাছপালা, মাটি, পাথর সব কিছু তালবিয়া( লাব্বাইক) পাঠ করতে থাকে,( তিরমিযী, হাদিস ৮২৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৯২১) । মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে হজ্ব করার তাওফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন ।

dsk tv